প্রথমেই বলি সৌম্যের ব্যাটিং স্টাইল নিয়ে ! সৌম্যের সব থেকে আক্রমাত্মক ব্যাটিং দেখেছি ২০১৫ বিশ্বকাপে ! ব্যাট উঁচিয়ে ধরা, একটু লীন করে শিকারের অপেক্ষায় থাকা, ফ্রন্ট ফুট- বেক ফুটের মাঝখানে পর্যাপ্ত স্পেস রাখা যাতে ওয়েইট ট্রান্সফারে সময় কম লাগে! দু-পায়ের অ্যাঙ্গেল কমফরট জোনে রাখা সব কিছুতেই সৌন্দর্য বিরাজ করত।

সৌম্য যখন ফরমে থাকে তখন তার ব্যাটিং-এ একটা ছন্দ থাকে ! প্রথমে একটু বেকফুটে যাওয়া সাথে ফ্রন্ট ফুট টাকেও নিয়ে যাওয়া তারপর বল পিচিং করার সময় পিচিং লাইনের কাছে ফ্রন্ট ফুট পজিশন করা সবকিছুই অ্যাবসোলিউট !

আমি জানিনা সৌম্য এই ছন্দটাকে শুধুই ছন্দ হিসেবেই ব্যবহার করে নাকি স্ট্রাইকিং ক্যাল্কুশন হিসেবেও ব্যবহার করে! আমার দেখা মতে এই স্টাইলটা সব ধরনের লেংথ লাইন বলকে স্ট্রাইক করার জন্য একটা আদর্শ ! কারণ এই স্টাইলে ব্যাটসম্যান মুহূর্তেই লেংথ বুঝে ফ্রন্ট ফুট অর বেক ফুটে আর্লি ওয়েঈট ট্রান্সফার করতে পারে ! বর্তমানে এই ছন্দে অনেক নিউ কামারদের ব্যাটিং করতে দেখেছি! তবে সৌম্য এখন তার এই ব্যাটিং স্টাইলকে সবসময় ইউটিলাইজ করতে পারে না যদি পারত তাহলে কোন লেংথের বল তার ব্যাটের মার থেকে বেঁচে যেতে পারত না আর তাকে আউট করাটাই কষ্টসাধ্য হয়ে যেত ! সৌম্যের প্রভ্লেম গুলো নিয়ে অন্য একদিন আলোচনা করব আজ শুধুই স্ট্রেংথ নিয়েই বলি!

এইখানে সৌম্যের কেজুয়াল শটগুলো নিয়ে বলছিনা, শুধুই রেয়ার শট গুলো নিয়েই বলব!

১। ২০১৫ বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের সাথে প্রথম ম্যাচে, বলটা ছিল ক্রস বল,কিছুটা ফুলার গুড লেংথ ডেলিবারী এন্ড বলটা পিচিং করেছিলো মিডল এন্ড অফ স্ট্যাম্পের মাঝামাঝি লাইনে। সৌম্য ব্যাটের মিডল দিয়েই ফ্লিক করে। শটটিতে স্পেশাল ছিল রিষ্টের ব্যবহার। আর শটটা ওই লাইন এন্ড লেংথের জন্য কখন খেলায় হয়নি এন্ড সেটাই পারফেক্ট শট ছিল। শুধুমাত্র এই শটটা নিয়েই ক্রিস্টায়ান রায়ান নামে একজন রাইটার পুরো একটা আর্টিকেল লিখেন। সেটি এখনও ক্রিকিনফোতে পাবেন ! এই পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারে শটটি ৪বার খেলে ফেলেছেন!

২। উপরে শটটি নিউজিল্যান্ডের সাথে আবার খেলে তবে এবার একটু ভিন্নভাবে! একই ম্যাচে একটা আউটসাইড অফ বাউন্সার বলে সৌম্য একটা স্কয়ার কাট খেলে! বলটিতে গতি ছিলোনা এন্ড কাঁধের উপরে দিয়ে ক্রস করে যাচ্ছিলো তবে সৌম্যের রিষ্টের জোরেই বলটি সারকেলের উপর দিয়ে কাভারের বাউন্ডারিতে চলে যায়। এই বাউন্ডারিটি বাঁচাতে গিয়েই ম্যাককুলাম আর একটুর জন্য হাত খোয়াতও! তার বিখ্যাত ডাইভগুলোতে তিনি সবসময় সফল হন বাট এই যাত্রায় পারলেন্না!

৩। পাকিস্তানের সাথে ৩য় ওডিআইতে সেঞ্চুরি করার পর স্পিন বলে এক্সট্রা কাভারে একটা ছক্কা মারেন ! ডাউন দা উইকেটে মারতে গিয়ে তিনি একটু গড়মিল করে ফেলেন। ইচ্ছে করলে সে উইথ দা টার্ন মিড উইকেটে মারতে পারতেন বাট ততক্ষণে ব্যাট পিচিং লাইনে পউছে যাওয়াতে অফ সাইডে চালিয়ে দেন সাথে বলে এক্সট্রা মমেন্টাম দিতে ব্যাটের সাথে নিজেকেও হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন! ফলাফল একটা আনএক্সপেক্টেড ছক্কা!

৪।সাউথ আফ্রিকার সাথে ১ম ওডিআইতে একটা ক্রস বল্ কে ফ্লিক করেন পয়েন্টে। বলটা ছিল ফুল লেংথের অফ স্ট্যাম্পে ! সাধারণত কেউ অফ স্ট্যাম্পের বল্ কে ফ্লিক করেনা । আর করলেও সেটা মিড উইকেটে যাবে বাট সে সেটাকে পয়েন্টে পাঠায়!

৫। সাউথ আফ্রিকার সাথে ২য় ও ৩য় ওডিআইতে সৌম্য ২টা স্কয়ার কাট খেলেন। শটটা সেম ছিল কিন্তু হা করে তাকিয়ে থাকার মতই ছিল। কাট টি সে ফ্রন্ট ফুটেই খেলেছিলও কিন্তু আফসোস এই ম্যাচ পরে সৌম্যের ফ্রন্ট ফুটের এই স্কয়ার কাট আর দেখা যায় নি!

৬। সাউথ আফ্রিকার সাথে ২য় ওডিয়াইতে অফ স্ট্যাম্প এন্ড মিডল স্ট্যাম্পের মাঝামাঝি লাইনে প্রায়ই ইয়রকার লেংথ ডেলিভারিকে টেনে নিয়ে মিড উইকেটে পাঠিয়ে দেই ! এইটা ওয়ান অফ দা টাফেস্ট ফ্লিক ছিলো সৌম্যের! বলটি নোবল ছিল!

৭। ইন্ডিয়ার সাথে ১ম ওডিআইতে অশ্বইন এর বলে একটা কাভার ড্রাইভ খেলেছিল সৌম্য। এই শট টা খুব কম ব্যাটসম্যানই খেলে। মিথুন,লিটন,বিরাট কোহলি এরা সবায় অফ স্পিনের ফুল লেংথ ডেলিভারিতে এই শট টা খেলে তবে তারা সবায় ব্যাটের টপ পার্ট দিয়েই খেলে তাই তারা শুধুই আউটসাইড অফের বল গুলোকেই মারতে পারেন। কিন্তু সৌম্য ড্রাইভটা খেলে ব্যাটের মিডল পার্ট দিয়ে ব্যাটকে উপরের দিকে গুরিয়ে। এই কারণে সে অফ স্ট্যাম্পের বলগুলোতেও এই ড্রাইভটা খেলতে পারে । বর্তমানে সৌম্যকে অফ স্পিনে প্রায়ই এই শট খেলতে দেখা যায়!

৮। এশিয়া কাপ ২০১৬ তে সৌম্য পাকিস্তানের সাথে ডাউন দা উইকেটে এসে একটা ছক্কা হাঁকান! এই শটটি ছিল অন্যরকম! সৌম্য হাতের কনুই না ভেঙ্গেই ফুল সুইঙ্গে ব্যাট চালান। মূলত ডাউন দা উইকেটে আশার কারণেই এই শট খেলতে পেরেছিলেন এর পর সে আর এই শট খেলে নি!

৯। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের সাথে ৩য় টি২০ সৌম্য একটা আপার কাট খেলেন ! তবে এই শটটা বাকি সব র‍্যাম্প শট থেকে ভিন্ন ছিল। অফ স্ট্যাম্পের লাইনে কাঁদের পাশ দিয়ে যাওয়া বল্কে সৌম্য লাফিয়ে আরো একটু উপরে তুলে দেন ব্যাটের বটম পার্ট দিয়েই !

১০। উপরের একই ম্যাচে সৌম্য একটা ফুল শট খেলেন পয়েন্টের পাশ দিয়েই। শটের ভিন্নতা বলতে বলের হাঈট্টা অনেক লো ছিল এন্ড অফ স্ট্যাম্পের ছিল। এই শটেও সৌম্যের রিষ্টের ক্রেডিট ছিল

১১। ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কার সাথে টেস্ট সিরিজে সৌম্য একটা ফ্লিক করেন যেটা পয়েন্টের পাশ দিয়ে স্ট্যাম্প লাইন পথে বাউন্ডারিতে চলে যায়। এই শটের স্পেশাল পার্ট হলো বলটা গুড লেংথ ডেলিভারি ছিল। এই লেংথের বলে কেউ ফ্লিক করেনা কিন্তু সৌম্যের রিষ্টের জাদুতেই এই শট টা খেলা সহজ হয়েছিলো। রিস্কও আছে এই শটে ! চ্যাম্পিয়ন্স ট্রপী তে সেম শট খেলতে গিয়ে মঈন আলীর হাতে জীবন পান সৌম্য

১২। ২০১৭ শ্রীলঙ্কার সাথে ১ম ট২০তে সৌম্য মালিঙ্গার বলে একটা পিক আফ শট খেলেন। সম্ভবত শট টিকে ড্রপকিক ও বলা হয় । মিডল স্ট্যাম্পের বল্ কে পাঞ্চ করে পয়েন্টের উপর দিয়ে পাঠিয়ে দেন। সেবার প্রথমই জানলাম সৌম্যের হাতে এই শট টিও আছে

১৩। ট্রাই নেশন সিরিজে ১ম ওডি আইতে আয়ারল্যান্ডের সাথে সৌম্য জাস্ট একটা শট খেলেই আউট হন। গুড লেংথ ডেলিভারি ছিল প্লাস ঘাসের উইকেট হওয়ার বাউন্সও ছিলো প্রচুর। সৌম্য সেটা বুঝতে পেরেই স্ট্যাম্পের উপরের এই বলটিকে একটু লাফিয়েই স্কয়ারে কাট করেন যাতে মিডলিং হয়।

১৪।ওই সিরিজের নিউজিল্যান্ডের সাথে ১ম ওডি আইতে সৌম্য ফিফটি করার সময় একটা শট খেলেন। এটা আসলে বাউন্ডারি ছিল না তবুও সেটা লিস্টে এড করলাম । গুড লেংথ প্লাস ক্রস বল ছিল বাউন্সও ছিল প্রচুর। সৌম্য ব্যাটিং এ যেভাবে দাঁড়ায় ঠিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল সৌম্য জাস্ট কনো মুভমেন্ট না করেই বলটাকে পিচিং থেকে শুরু করে তার ব্যাটে লাগা পর্যন্ত ফোলো করতে থাকে। বলটাও সোজা গিয়ে তার আগে থেকে পজিশন করা ব্যাটে গিয়ে লাগে। মূলত সিঙ্গেল নেওয়ার জন্যই সে এই শট টা খেলেছিলও। তবে এই শট টা এখন অনেক ব্যাটসম্যানকেই দেখি ট্রাই করতে।রোহিত শরমাও তাদের মধ্যে একজন তবে হাস্যকর বেপার হল সে এই শট খেলার সময় ইন সাইড এডজ হয় অনেক সময়।

১৫। ২০১৭ সালে সাউথ আফ্রিকার সাথে ১ম টি২০তে ১ম ছক্কাটা মারার আগে সৌম্য একটা শট খেলেছেন কেউ কি খেয়াল করেছেন? বলটা লেগ স্ট্যাম্প লাইনে গুড লেংথে পিচিং করে ক্রস করছিলো । সৌম্য জাস্ট রিষ্ট স্ট্রং রেখেই একটা টোকা দিয়েছিলো। বলটি গ্যাপে পরে আস্তে আস্তে বাউন্ডারি তে চলে যায় প্রায়।মিলার বাকি এক রান বাঁচিয়েছিলও!

১৬। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রপি ২০১৭ তে ইংল্যান্ডের সাথে একটি এপিক কাভার ড্রাইভ খেলেন। আমার কাছে এপিক হলেও আপনাদের কাছে হয়তো নাও হতে পারে। সাধারণত সব ব্যাটসম্যান ফুল লেংথ অর ফুলার গুড লেংথ বল গুলোকেই ড্রাইভ করে। বাট বলটি ছিল পিউর গুড লেংথ ডেলিভারি। জ্যাক বল এর সেই বলটিকে সৌম্য একটু লীন করে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে দেন। এটা আমার দেখা সৌম্য এর সব থেকে টাফেস্ট কাভার ড্রাইভ।

এরকম আর নতুন কিছু পেতে থাকবেন সৌম্যের মাঝে। আমি সব শট তুলে ধরিনি। শুধু মাত্র যেসব শট টাফ ছিল এন্ড ক্রিকেটে রেয়ার জাস্ট সেসব শটই তুলে ধরলাম। এই পোস্ট টা দেওয়ার একটা কারণ ছিল । কারণটা অন্যদিন বলব আজ আর পারছিনা!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here