“কুরস্ক” রাশিয়ার ডুবে যাওয়া একটি শ্রেষ্ঠ সাবমেরিন (পূর্ণাঙ্গ ঘটনা)

বিংশ শতাব্দীতে যে কয়টি সাবমেরিন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে তাদের মধ্যে ব্যারেন্টস সাগরে ডুবে যাওয়া কুরস্ক দুর্ঘটনা অন্যতম । কুরস্ক কে-১৪১, ২০০০ সালের ১২ আগস্ট সবকয়জন আরোহী সহ ব্যারেন্টস সাগরের ৩৩০ ফুট নিচে তলিয়ে যায় । তৎকালীন সময়ে সাবমেরিন উদ্ধারের জন্য খুব বেশী উন্নত প্রযুক্তি না থাকায় সাবমেরিনে আটকে থাকা ১১৮ জন ক্রুর সকলকেই নির্মম পরিনতি ভোগ করতে হয় । সাবমেরিনটি ছিল ৫০৫ ফুট লম্বা এবং ৬০ ফুট চওড়া । সমুদ্র তলে এর গতিবেগ ঘন্টায় ৩২ নট এবং সমুদ্রপৃষ্টে ১৬ নট গতিবেগে এটি চলতে পারত । কুরস্ক ১৮,০০০ টন ওজন বহন করতে সক্ষম ছিল । জ্বালানী হিসেবে কুরস্কে ২ টি নিউক্লিয়ার রিএক্টর ছিল , যা এটিকে চলাচলের জন্য অফুরন্ত শক্তি সববরাহ করত । ক্রুদের খাবারের সঙ্কট নাহলে কুরস্ক সমুদ্রের তলদেশে অনায়াশে শতবর্ষ চলতে পারত । সাবমেরিনটি ১৯৯৪ সালে প্রথম যাত্রা শুরু করে । ১৯৯৯ সালে অ্যামেরিকার “৬ষ্ঠ নৌবহরের” নজরদারিতে থাকা মিশন সম্পন্ন করে রাশিয়ায়  সফলভাবে ফেরত আসে এই “এলিট ক্লাস” সাবমেরিনটি । ২০০০ সালের আগষ্ট মাসে কেনেডি লিয়াকশোন কে ক্যাপ্টেন হিসেবে নিয়োজিত করা হয় ।

কুরস্ক
ছবিঃ কুরস্ক । image source:https://www.rferl.org/a/kursk-disaster-putin-turning-point-russia/27184505.html

১২ আগষ্ট,২০০০ সাল, সকাল ১১.২০ দক্ষিন ব্যারেন্টস সাগরে, (যেখানে গ্রীস্মেও তুশারপাত হয়ে থাকে) রাশিইয়ার নৌ-বহরের নিজেদের মহরা শুরু হয় । এই মহরায় নৌ-বহরের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড কিংবা আমেরিকা ছিল না, প্রতিপক্ষ ছিল রাশিয়ার –ই একটি সাবমেরিন যার নাম ছিল কুরস্ক কে-১৪১ । কুরস্কের ক্যাপ্টেন এবং ক্রুরা এই মহড়াতে আক্রমনের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে । রাশিয়ান বহরের অন্যতম রনতরী “পিটার দি গ্রেট” এর বিপক্ষেই প্রথমে মহড়া শুরু হয় । ৫ বছর ধরে সাবমেরিনটির দায়িত্বে থাকা ল্যাফটেন্যান্ট ক্যপ্টেন দিমিত্রি কালাশ্নিকভ মহড়ার মাত্র কয়েকদিন আগেই বিয়ে সম্পন্ন করেন এবং সাবমেরিন দেখাতে তার স্ত্রী ওল্গাকে নিয়েও আসেন । কিন্তু মহড়া শুরু হওয়ার পর ঐদিন সাবমেরিনটিতে আসলে কি ঘটেছিল তা পৃথিবীবাসীর পক্ষে হয়ত কখনোই জানা সম্ভব হবে না । তবে পরবর্তিতে ব্যাপক অনুসন্ধানের ফলে দুর্ঘটনা ঘটার কারনগুলো বের হয়ে আসে ।

ছবিঃ ফ্যাট গার্ল টর্পেডো । Image source:http://engine.aviaport.ru/issues/54/pics/pg52pc10big.jpg

মহড়া শুরুর কিছুক্ষন পরেই ক্যপ্টেন লিয়াকশন সাবমেরিনের গতি কমিয়ে ঘন্টায় ৮ নট করার নির্দেশ দেন । এরপর তিনি ৯০০০ পাউন্ডের ৬৫-৭৬ টর্পেডো (যা “ফ্যাটগার্ল” নামে পরিচিত)নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুতির আদেশ দেন । এই টর্পেডোগুলো কেরোসিন তেল দ্বারা প্রোপেলড হয় । কিন্তু এটি সমুদ্রের তলদেশ থেকে নিরাপদে নিক্ষেপের জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয় । আর এই শক্তি যোগানের জন্য টর্পেডোগুলোতে ব্যবহার করা হয় “হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড” । এটি খুবই সাধারন একটি যৌগ । কিন্ত উপযুক্ত পরিবেশে কপার অথবা ব্রাস এর সংস্পর্শে এলে এটি অতি মাত্রায় ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে ।

বিক্রিয়ায় প্রচুর তাপ এবং চাপ উৎপন্ন হয় । এজন্য এই পার-অক্সাইড টর্পেডোগুলোকে প্রতিনিয়তই রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয় । দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, কুরস্ক এ যে টর্পেডোগুলো নেয়া হয়েছিল তার অধিকাংশগুলোকেই নিয়ম-মাফিক রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি । আর এর মাশুল দিতে হয়েছিল ১১৮ জন আরোহীর সকলকেই ।

টর্পেডো ছোড়ার আগ-মুহূর্তে হটাৎ ব্যাপক শব্দে টর্পেডো রুমে একটি টর্পেডো বিস্ফোরিত হয় । সেখানকার তাপমাত্রা মুহুর্তেই ৫০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌছায় । এর কিছুক্ষন পরেই একসাথে আরো চারটি টর্পেডোর বিস্ফোরন হয় । শক্তিশালী সাবমেরিনটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে ব্যারেন্টস সাগরের ৩৩০ ফুট নিচে সমুদ্র পৃষ্টতলে পতিত হয় । এত বড় বিস্ফোরনেও সাবমেরিনের নিউক্লিয়ার রিএক্টরের কোন ক্ষতি ই হয়নি । সাবমেরিনের ১১৮ জনের মধ্যে সকলেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়, ২৩ জন বাদে । কুরস্ক অনেকগুলো কম্পার্টমেন্টে বিভক্ত ছিল । এর মধ্যে ৪ টি কম্পার্টমেন্ট কোন ক্ষতির সম্মুখিন হয়নি । এগুলোতেই সাবমেরিনের ২৩ জন তখনো বেচে ছিল । সাবমেরিনটিতে ২ টি দুর্ঘটনাকালীন “ইমার্জেন্সি ইস্কেপ হ্যাচ” ব্যাবস্থা ছিল । সৌভাগ্যবশত একটি সম্পুর্ণ অক্ষত থেকে যায় । কিন্তু চাইলেও এটি ব্যাবহার করা সম্ভব ছিল না । কারন কেউ যদি এটি ব্যবহার করে এবং খুব দ্রুত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উদ্ধার না হয় তাহলে তাকে হইপোথার্মিয়ায় নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে হবে । কিন্তু এর চেয়েও বড় সমস্যা তৈরী হয় ৯ম কম্পার্টমেন্টে ।

ছবিঃকুরস্কের বিভিন্ন কম্পার্ট্মেন্ট । http://www.users.cloud9.net/~bradmcc/gif/kurskDiagram.gif

সেখানে নিয়ক্লিয়ার টার্বাইনটি তখনো সচল ছিল, যদিও কুরস্কের পক্ষে কোনভাবেই আগানো সম্ভব ছিল না, টার্বাইনটি অ্যাকটিভ থাকায় ধীরে ধীরে পানি ঢুকতে শুরু করে । তাছাড়া সেই মুহুর্তে সমুদ্রের ৩৩০ ফুট নিচে থাকায় কম্পার্টমেন্টগুলোতে পানির ব্যাপক চাপ অনুভুত হতে থাকে । এমন কঠিন মুহূর্তে ল্যাফটেন্যান্ট কালাশ্নিকভ সবাইকে উদ্ধারের জন্য অপেক্ষার নির্দেশ দেন । এছাড়া তাদের জন্য আর কিছু করার ও ছিল না । কেননা, তারা যদি ৩৩০ ফুট নিচ থেকে অক্সিজেন মাস্ক ব্যাবহার করতেও চায় তবুও পানির চাপে হৃদপিন্ড বন্ধ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হবে । কালাশ্নিকভ তার স্ত্রীকে উৎসর্গ করে একটি চিঠি লিখেন । যা পরবর্তীতে পাওয়া যায় ।

ছবিঃ সাবমেরিন রেসকিউ সিস্টেম । Image source: http://u0v052dm9wl3gxo0y3lx0u44wz.wpengine.netdna-cdn.com/wp-content/uploads/2015/09/Nato-Submarine-Rescue-System-12-e1442608488851.jpg

দুর্ঘটনার ১২ ঘন্টা পর রাশিয়ান নৌবাহিনী “ইমার্জন্সি” ঘোষনা করে । উত্তর নৌ-বহর সাবমেরিনটি উদ্ধারের এর জন্য রওনা দেয় । দুর্ঘটনার ৩০ ঘন্টা পর মূল উদ্ধার অভিযান শুরু হয় । কিন্তু রাশিয়ান নৌ-বাহিনীর পক্ষে ক্ষুদ্র একটি রেস্কিউ-সাবমেরিন দিয়ে এই উদ্ধার অভিযান করা সম্ভব ছিল না । তখন ব্রিটিশ এবং আমেরিকান প্রযুক্তি ছিল উল্লেখ্যযোগ্যভাবে উন্নত । তারা রাশিয়ার এমন বিপর্যয়ে সাহায্য করতে এগিয়েও আসতে চাইলেও তৎকালীন নৌ-অ্যাডমিরালরা প্রত্যাক্ষান করে । গৌরব, অহংকার ই ছিল একমাত্র কারন । কেননা, কুরস্ক উদ্ধারে অন্য কারো সাহায্য কামনা করা নিজেরদের কারিগরী দক্ষতা অপ্রতুলতারই শামিল । এরই মধ্যে সমুদ্রেও ঝড় বইতে শুরু করে যার ফলে উদ্ধারকার্য সাময়িক বন্ধ রাখতে হয় ।

ছবিঃ কুরস্কের উদ্ধারকৃত অংশ । Image source: https://spotterup.com/wp-content/uploads/2017/07/NXGsceK.jpg

এদিকে সাবমেরিনের ভেতরে আটকে থাকা ক্রুরা অক্সিজেনের অভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে থাকে । সাবমেরিনটি ছিল উচ্চতায় চারতলা সমান । ফলে কম্পার্ট্মেন্টগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন থাকাটাই স্বাভাবিক । কিন্তু সাবমেরিনের বিভিন্ন অংশে আগুন ধরে যাওয়ায় অতিদ্রুত অক্সিজেন কমে যাচ্ছিল । তাছাড়া অক্সিজেন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ততক্ষনে বিকল হয়ে গিয়েছিল । সাবমেরিন ডুবে যাওয়ার ঘটনায় সারা রাশিয়া জুড়ে তোলপাড় শুরু হয় । প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই ইস্যুটিতে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হন । অবশেষে ব্রিটিশ এবং নরওয়ের রেসকিউ টিম কে রাশিয়া এই অভিযানে সাহয্য করতে অনুরোধ করে । দুর্ঘটনার অষ্টম দিন, ১৯ তারিখ ১১.৩০ এ “নরম্যান্ড পাইয়োনিয়ার” কুরস্কের এর উপরিভাগে অবস্থান নেয় । কিন্তু তখনো রাশিয়ার নৌ-অ্যাডমিরালদের অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হয় । অবশেষে অনুমতি পাওয়ার পর অভিযান শুরু হয় । রেসকিউ-সাবমেরিন নিয়ে উদ্ধারকারীরা কুরস্কের মূল অংশে পৌছায় । এর পর হাতুরি দিয়ে কুরস্কের গায়ে সজোরে একের পর এক আঘাত করে ভেতরে আটকে থাকা স্ক্রুদের জানান দেওয়ার চেষ্টা করা হয় । কিন্তু তখন অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে । কম্পার্ট্মেন্টগুলো থেকে কোন ধরনের সাড়া আসেনা । উদ্ধারকারীরা কুরস্কের আরোহীদের ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যায় । এতদিনে অক্সিজেনের অভাবে ধীরে ধীরে সকলেই মৃত্যুমুখে পতিত হয় । এরপর কুরস্কের নিরাপত্তা ডাকনি খুলে সকলের মৃত্যু নিশ্চিতে সত্যতা নিরুপন হয় ।

প্রায় ১৪ মাস পর ৭ই অক্টবর, ২০০১ সালে হল্যান্ডের উদ্ধারযান দিয়ে কুরস্ক কে ভূমিতে তুলে আনা হয় । এভাবেই অনেকগুলো প্রান আর “অস্কার-২” সিরিজের শক্তিশালী প্রযুক্তির ডুবোযান “কুরস্ক” অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে ।

    • Featured Image Source : https://gdb.rferl.org/1474C07C-FF98-485D-9174-D68E59AA6FD5_cx0_cy10_cw0_w1023_r1_s.jpg

Author: Mamun Sezan

Co-Founder & Sub-Editor