বিট কয়েন এবং এর আদ্যোপান্ত

বর্তমান সময়ে যে কয়টা হট কেক আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিটকয়েন । খুব কম মানুষই আছেন যারা এই মহামূল্যবান ক্রিপ্টোকারেন্সিটির নাম শুনেন নি! তবে বিটকয়েন নিয়ে ভাল জ্ঞান রাখেন এমন লোকের সংখ্যা খুব একটা বেশি না । বিটকয়েন কি! কিভাবে এটি আসল? কেনই বা এটি এত মূল্যবান এটি নিয়েই আজকের এই লিখা ।

প্রথমেই জানা প্রয়োজন ক্রিপ্টোকারেন্সি কি? ক্রিপ্টোকারেন্সি শব্দটা প্রথম আসে ২০০৯ সালে “সাতোশি নাকামোটো” নামের একজন লোকের কাছ থেকে । ক্রিপ্টোকারেন্সি হচ্ছে, একধরনের ভার্চুয়াল মুদ্রা/সম্পত্তি যেটি লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এটি “ক্রিপ্টোগ্রাফির” মাধ্যমে প্রতিটি ট্রান্সেকশন যথেষ্ঠ নিরাপত্তার সাথে সম্পন্ন করে থাকে । বর্তমানে বিটকয়েন ছাড়াও অনেকগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি রয়েছে । এগুলো হচ্ছে “লাইট কয়েন”, “ইথারিয়াম”, “জিক্যাশ” , “ড্যাশ”, “রিপল”, “মনেরো” ইত্যাদি । তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুল্যবান হচ্ছে বিটকয়েন । প্রায় প্রতিমুহুর্তেই এর দাম বেড়ে চলেছে । এই মুহুর্তে ১ BTC(বিটকয়েন) = ৮,২১৬ ডলার বা ৭ লক্ষ টাকা (প্রায়) ।

ছবিঃ ক্রিপ্টোকারেন্সি, image source: http://bottomstack.com/wp-content/uploads/2017/07/cryptocurrency.jpg

২০০৮ সালে যখন প্রায় সারাবিশ্বেই অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল তখন সবাই এমন একটা অর্থ-ব্যবস্থা খুজছিল যেটি হবে সম্পুর্ণ বিকেন্দ্রীভূত , নিরাপদ, সীমিত সববরাহের এবং অবশ্যই “পিয়ার টু পিয়ার” । “পিয়ার-টু-পিয়ার” সাধারনভাবে বলতে গেলে বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত হোয়াটস অ্যাপের মত, যেটা ডিভাইস টু ডিভাইস কাজ করে । আর এই ধারনা থেকেই সাতোশি নাকামোটো (ছদ্দনাম) নামের  একজন, যিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে সর্বপ্রথম ২০০৮ সালের অক্টোবরে “metzdowd.com” এর “ক্রিপ্টোগ্রাফি মেইলিং লিস্ট” এ  Bitcoin: A Peer-to-Peer Electronic Cash System”  নামের একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন । এখান থেকেই সর্বপ্রথম বিটকয়েনের যাত্রা শুরু হয় । ৯ জানুয়ারি,২০০৯ সালে বিটকয়েনের প্রথম ভার্সন “বিটকয়েন ০.১” প্রকাশিত হয় । এরপর নাকামোটো “bitcoin.org” নামে একটি ডোমেইন খুলে সেখানে বিভিন্ন ডেভেলপারদের সম্মিলিত করতে থাকেন ।  ২০১০ সালের মাঝামাঝি বিটকয়েন সফটওয়্যারে তাদের সাথে সম্মিলিত ভাবে আরো আপডেট করে, হঠাৎ তিনি অদৃশ্য হয়ে যান । কিন্তু এর আগে তিনি নিজে এর কিছু পরিবর্তন করে যান । এত সময়ের মধ্যে সাতোশি নাকামোটো কখনোই জনসম্মুখে আসেন নি । ফলে সাতোশি নাকামোটো সকলের কাছেই রহস্য ।  তবে এর আগে তিনি ১ মিলিয়ন বিটকয়েন নিজের কাছে রেখে দেন, যা মোট বিটকয়েনের ৫% ।

ছবিঃ বিটকয়েন, image source: https://s.aolcdn.com/hss/storage/midas/965692164ae9fdec65f7a1cc30e17c11/205307898/bitcoins.jpg

দিন দিন বিটকয়েনের দাম অলৌকিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে । এর প্রধান কারন বিটকয়েন খুবই সীমিত । সর্বমোট মাত্র ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন উৎপাদন সম্ভব হবে । ইতিমধ্যেই, ১৬,৬৮৯,৪২৫ বিটকয়েন মাইনিং হয়ে গেছে (১৯ নভেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত) । অর্থাৎ আর মাত্র ৪,৩১০,৫৭৫ বিট-কয়েন বাকি আছে । বিটকয়েনের উৎপাদন ক্রিয়ায় মজার একটা ব্যাপার আছে । প্রতি চার বছর পর পর এর উৎপাদন অর্ধেক হয়ে যাবে । শুরুতে প্রতি মিনিটে ৫০ টি বিটকয়েন উৎপন্ন হত । নভেম্বর, ২০১২ থেকে ২৫ টা এবং জুলাই, ২০১৬ থেকে ১২.৫০ টি বিটকয়েন উৎপন্ন হচ্ছে । ২১৪০ সালের মধ্যে সকল বিটকয়েন মাইনিং শেষ হয়ে যাবে ।
বিটকয়েনের দাম অর্থনীতির “চাহিদা-যোগান” থেকেই এসেছে । যত বিটকয়েন কমছে, চাহিদা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে । মূল্যও সেভাবে বেড়ে চলেছে ।

ছবিঃ বিটকয়েন ডাটা পয়েন্ট, image source: https://blockchain.info/charts/total-bitcoins?showDataPoints=true

বিটকয়েন উৎপাদন প্রচুর ব্যায়সাপেক্ষ পদ্ধতি । উদাহরণ হিসেবে, চাইনিজ চারজনের একটা গোপন গ্রুপ একদম গ্রাম্য পরিবেশে ৬ তলে একটি বিল্ডিংয়ের পুরোটাই মাইনিং এর কাজে লাগাতেন । তারা ২০১৪ সালে প্রতি মাসে ৪০৫০ BTC উৎপাদন করতে পারতেন এবং এতে তাদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল আসত ৮০,০০০ ডলার । মাইনিং করার জন্য মাইনার মেশিনগুলো পাওয়ারে সংযোগ দিতে হয় । এরপর মাইনারগুলো অনলাইনে যাওয়া মাত্রই কম্পিউটার এডজাস্টমেন্ট করে নেয় এবং এলগরিদম জেনারেট করতে থাকে । সঠিক কুয়েরি হলেই রিওয়ার্ড হিসেবে বিটকয়েন দেয়া হয় ।

বিট কয়েন হচ্ছে “ওপেন সোর্স সফটওয়্যার প্রোটোকল” অর্থাৎ যে কেউ এই প্রোটোকল ব্যবহার করতে পারবে, কোন একজন ব্যক্তি অথবা কোম্পানি দ্বারা এটি নিয়ন্ত্রিত হবে না । এর সফটওয়্যারের প্রতিটি পরিবর্তন মুক্ত এবং স্বচ্ছ । সাতোশি নাকামোটো  বিট কয়েনের প্রথম কোড তৈরি করেন । এরপর বিটকয়েনের ফিচার এবং নিরাপত্তা নিয়ে শত থেকে হাজার পর্যন্ত প্রোগ্রামার নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন । যা বিটকয়েনকে করেছে অনন্য! এখন আপনার মনে কৌতুহল হতেই পারে, হ্যাকিং করে অন্যের কিছু বিটকয়েন বাগিয়ে নিতে । কিন্তু এটি পারতপক্ষে একদমই অসম্ভব , আর এর উত্তর তৈরী করেছে সাতোশি নিজেই । বিটকয়েন কম্পিউটারের কোন ফাইল না, এটি খুব সাধারন একটি “এন্ট্রি” । এগুলো সংরক্ষিত থাকে হার্ড-ডিস্কে । সুতরাং কেউ যদি তার হার্ড-ডিস্ক হারিয়ে অথবা নষ্ট করে ফেলেন, তবে তার হারানো বিট কয়েন আর কখনই উদ্ধার করা সম্ভব হবে না ।

বিটকয়েন লেনদেনে ব্যবহৃত হয় ব্লকচেইন । অনেকেই ব্লকচেইন এবং বিটকয়েনে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন । ব্লকচেইন হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সি/ডিজিটাল কারেন্সি একজন থেকে আরেকজনের কাছে ট্রান্সফারের টেকনোলজী । ব্লকচেইনের মূলনীতি খুবই সাধারনঃ “Open Ladger” অর্থাৎ “লেজার হবে সকলের জন্য মুক্ত” । এই ব্যাপারটি অর্থনীতির ছাত্রদের বুঝতে খুব সুবিধা হবে । তবে সকলের জন্য আমি খুব সহজ ভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছি ।

ছবিঃ ব্লকচেইন, image source: https://magazine.seats2meet.com/wp-content/uploads/2017/09/Blockchain.jpg

ব্লক-চেইনে প্রতিটি ট্রানজেকশন নেটওয়ার্কের সকলেই দেখতে পারে । অর্থাৎ নেটওয়ার্কে প্রত্যেকে সহজেই দেখতে পারে কোথায় কত টাকা আছে, কে কত টাকা লেনদেন করতে পারবে, এবং নেটওয়ার্কের যে কেউ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে একটি লেনদেন সম্পন্ন হতে পারবে কিনা । সুতরাং কারো কাছে যদি ১০ টাকা থাকে আর সে ১৫ টাকা অন্য কাউকে পাঠাতে চায় তাহলে পাওনাদার/ সকল ইউজার সহজেই বুঝতে পারবেন এই ট্রানজেকশনটি সম্ভব নয় ।
ব্লক চেইনের মাধ্যমে নেটওয়ার্কের সকলের কাছেই প্রতিটি সফল ট্রানজেকশন “লেজার” এ জমা হয় । এবং নতুন ট্রানজেকশন সম্পন্ন হলে নেটওয়ার্কের সকলের কাছেই একটি নোটিফিকেশন যায় । তবে বিটকয়েনের ক্ষেত্রে ব্লকচেইন অ্যালগরিদম আরো  জটিল ।

ছবিঃ ওপেন লেজার, image source: https://2.bp.blogspot.com/-ZCAhsOLXH-A/V-hyhY4LTJI/AAAAAAAACOg/XTBsYWe_ZMI9c8_oVS6XxwI2zdyHXdncgCLcB/s1600/OPEN-GRC.png

এখন মনে করি , নেটওয়ার্কের একজনের কাছে  ১৫ বিট কয়েন আছে । সে ১০ বিট কয়েন আরেকজনকে  দিতে চায় । এক্ষেত্রে, ট্রান্সফারটি সম্পন্ন হতে অবশ্যই একটি “লেজার” নেটওয়ার্কের সকলের কাছে পৌছে দিতে হবে । এখানে থেকেই মাইনর এর ধারনা প্রবর্তিত হয় । মাইনর মূলত একটি “Unvalid” ট্রানজেকশনকে “Valid” ট্রানজেকশনে পরিনত করে । একটি নেটওয়ার্কে অনেকগুলো মাইনর থাকতে পারে । কেউ যখন একটি ট্রানজেকশন করতে যায় তখন নেটওয়ার্কের প্রত্যেকটি মাইনর একটি “Special key” খুজে যেন ট্রাঞ্জেকশোন টি  “Valid”  করা যায় । সর্ব প্রথম যেই মাইনর “Special Key” টি খুজে পাবে সেই তার কাজের পুরস্কার হিসেবে কিছু বিটকয়েন (BTC) পাবে ।

ছবিঃ বিটকয়েন মাইনার, image source: https://goanadupabitcoin.ro/wp-content/uploads/2017/07/bitcoin-minare-de-acas%C4%83.jpg

মাইনররের কাজ প্রধানত দুটিঃ
১. একটি নতুন ট্রানজেকশন কে validate করা,
২. “Special key” আগের ট্রানজেকশন টাকে লক করে  নতুন ট্রানজেকশন সম্পন্ন করে এবং লেজারে যোগ করে নেটওয়ার্কের সকলকেই জানান দেয় ।

বিটকয়েন উৎপাদনের জন্য কম্পিউটারকে “Extremely difficult math equations” সমাধান করতে হয় । এটি বিভিন্ন বর্ণ/নাম্বারের হ্যাশ । হ্যাশ হচ্ছে একটি ম্যাথড যা একটি লকের জন্য সমাবেশ অনুমান করে ।  (হ্যাশ রেট= প্রতি সেকেন্ডে অনুমিত সমাবেশ সংখ্যা)  । এক্ষেত্রে, কম্পিউটারের প্রসেসরের চেয়ে গ্রাফিক্স কার্ডের হ্যাশ রেট বেশি ।

অনেকেই মনে করেন বিটকয়েনের কোন ভবিষ্যত নেই । এর মূল্য যেকোন দিনই কমে যেতে পারে । যেহেতু বিটকয়েন মোট সংখ্যা ২১ মিলিয়ন , এটি ডিফ্লেশন হতে পারে। মোট বিটকয়েনের সংখ্যা যত বেশি হবে, প্রতি বিটকয়েন মুল্য ততই বৃদ্ধি পাবে । এই সিস্টেমটি প্রথম দিকে গ্রহণকারীদের পুরস্কৃত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে । যেহেতু একসময় প্রতিটি বিটকয়েন উৎপাদন মূল্যবান হবে, তখন কিভাবে ব্যয় করা হবে সেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই কারণে যে, বিটকয়েন অর্থনীতি খুব তাড়াতাড়ি ঘটেছে এবং অনেক ভাবেই পূর্বাভাসযোগ্য নয় । এটি নিশ্চিত যে কোন ভাবে যদি মোট বিটকয়েনের ৫০ ভাগের অধিক কোন ব্যাক্তি বা গ্রুপ নিয়ে নেয় সেক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে । তবে বিটকয়েনের “ওপেন লেজার” এর জন্য এটি একরকম অসম্ভব ।

    • Featured Image Source : https://fortunedotcom.files.wordpress.com/2016/09/bitcoin.gif

Author: Mamun Sezan

Co-Founder & Sub-Editor