প্রথম বিশ্বযুদ্ধঃ মানব ইতিহাসের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ যুদ্ধের ইতিহাস

যুদ্ধ মানব সভ্যতার সাথে সেই আদিকাল থেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকেই এই গ্রহের মানুষ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করে আসছে। বেঁচে থাকার তাগিদে কখনো বা তারা যুদ্ধ করেছে হিংস্র জীবজন্তুর সাথে ,কখনো বা প্রতিকূল আবহাওয়ার সাথে। তবে যুদ্ধ বললে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষ যে যুদ্ধের কথা মনে করে সেটা হচ্ছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।এর বেশ কিছু কারণও আছে। এই যুদ্ধ ছিল ধ্বংসযজ্ঞে বৈজ্ঞানিক কলাকৌশলের প্রয়োগ যেমন – বিগ বার্থা নামক আর্টিলারি,  গ্রেনেড, অ্যাকশন রাইফেল, বেয়োনেট, ল্যুগার পিস্তল, ম্যাক্সিম মেশিন গান, মাসচিনেনজিউহর নামক মেশিন গান,লিটিল উইলি ট্যাঙ্ক, টর্পেডো, ধোঁওয়াবিহীন গান পাওডার,ওয়ারলেস কমিউনিকেশন ইত্যাদি আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার এই যুদ্ধের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই শুরু হওয়া এই যুদ্ধে প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। আজকের এই লেখায় আমি আপনাদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা, কারণ এবং এর ফলাফলের বিশ্ব রাজনীতিতে যে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল সেই গল্প শোনাব।

Big Bertha Siege Gun
বিগ বার্থা সিইজ গান। Image Source : https://www.militaryfactory.com/armor/imgs/420mm-type-mgerat-14-l12-big-bertha-siege-gun.jpg

যুদ্ধের সুত্রপাত ও কারণঃ

উনিশ শতকের কথা। মধ্য ইউরোপের একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান এম্পায়ারহাবসবার্গ রাজবংশ এই সাম্রাজ্যটি শাসন করত। হাবসবার্গ রাজবংশ ১৮৬৭ সালের একটি সমঝোতার মাধ্যমে হাঙ্গেরি শাসন করতে সম্মত হয়।সেই সময় তুরস্কের অটোমান সুলতানের শাসনাধীন ছিল বলকান (গ্রিস ও তুরস্কের উত্তরে) ।এর মধ্যে অন্যতম ছিল শ্লাভ অধ্যুষিত বসনিয়া-হার্জেগোভিনা অঞ্চল ১৮৭৮ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয় সাম্রাজ্য বসনিয়া-হার্জেগোভিনা দখল করার জন্য উঠে পড়ে লাগল। অত্র বসনিয়া-হার্জেগোভিনা অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছিল সেই সময়। অন্যদিকে অটোম্যানদের ক্ষমতাও কমে আসছিল। এরই সুযোগ নেয় অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়রা১৯০৯ বসনিয়া-হার্জেগোভিনা দখল করে ফেলে তারা। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় তীব্র বসনিয়া সংকটের।বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বসনিয়রার মুক্তিকামী জনতা। এদিকে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়দের এমন আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে ভীষণ চটে যায় রাশিয়া। বসনিয়ায় সৃষ্টি হয় কিছু উগ্রপন্থি জাতীয়তাবাদী দল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ইয়ং বসনিয়া’ বা মালদা বসনা। এদের লক্ষ্য ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরী শাসন থেকে মুক্তি। গাভরিলো প্রিন্সিপ নামক ১৯ বছরের এক তরুণ  ছিল ‘ইয়ং বসনিয়া’ দলের একনিষ্ট সদস্য। তিনি ছিলেন সার্বিয়ান বিচ্ছিন্নবাদী।

Map of the Austro-Hungarian Empire in 1914
অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয় সাম্রাজ্য। Image Source : https://nzhistory.govt.nz/media/photo/map-austro-hungarian-empire-1914

১৯১৪ সালের ২৮ জুন। দিনটি ছিল রবিবার। ঘড়িতে সময় তখন ১০ টা বেজে ১৫ মিনিটবসনিয়ার রাজধানী সারাজেভোর ফুটপাতের একটা ক্যাফেতে বসে স্যান্ডউইচ খাচ্ছিল গাভরিলো প্রিন্সিপ। হঠাৎই তার চোখ পড়ে একটি কালো রঙের কনভাট্রিবল গাড়িতে। গাড়িতে বসে ছিল ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ। পাশে ছিল তার  স্ত্রী সোফি। ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ছিলেন অস্ট্রো -হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যে আর্কডিউক বা হাবসবার্গ রাজবংশের একজন সম্মানীয় সদস্য এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান এম্পায়ারের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী। একারণে তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল গাভরিলো প্রিন্সিপ  এর কাছে। তাই কোন রকম কাল বিলম্ব না করে প্রিন্সেপ পিস্তল বের করে মাত্র ৫ ফুট দূর থেকে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ এর দিকে। প্রিন্সেপ সেই সময় ধারণাও করতে পারেনি তার ছোঁড়া এই কয়েক রাউন্ড গুলিই পরবর্তীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। প্রিন্সেপ বসনিয়া-হার্জেগোভিনা কে মুক্তি করার লক্ষ্যেই ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ কে হত্যা করেছিল। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডই ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ এবং সূচনা।

এই হত্যাকাণ্ডের ফলে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ানরা সার্বিয়ার উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় এবং সার্বিয়াকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানায়। সার্বিয়া তদন্ত কমিটি গঠন করে।কিন্তু অস্ট্রিয়া একটি নির্দিষ্ট সময় ও কিছু শর্ত বেঁধে  দেয় এবং তদন্ত কমিটিতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি নিয়োগের দাবী জানায়। সার্বিয়া এর সব শর্ত মানতে অস্বীকার করে।

অস্ট্রিয়া তখন আক্রমনাত্নক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয় এবং জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেইম এর কাছে সমর্থন আহবান করে। উইলহেইম অস্ট্রিয়াকে পূর্ণ সমর্থন দেয়ার ঘোষণা দেয় এবং অস্ট্রিয়ার দাবীর সাথে একাত্নতা প্রকাশ করে। আক্রমনাত্নক পদক্ষেপের জন্য জার্মানির সমর্থন আবশ্যক ছিল অস্ট্রিয়ার কাছে। কারণ, সেই সময় জার্মানি ছিল অথনৈতিক ও সামরিক উভয় দিক থেকেই শক্তিশালী রাষ্ট্র। জার্মানী-অস্ট্রিয়ার এই যৌথ শক্তির বিপক্ষে সার্বিয়ার পেছনে এসে দাড়ায় জার্মানীরপ্রতিবেশী ফ্রান্স এবং রাশিয়া এবং সার্বিয়া আক্রমনের জন্য অস্ট্রিয়াজার্মানির মধ্যে পরপর ভিন্ন ভিন্ন চুক্তির ফলে  জার্মানী-অস্ট্রিয়ার সাথে ফ্রান্স- রাশিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।এভাবেই সূত্রপাত ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের।কিন্তু তখনও সেটি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়নি। এটি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয় যখন জার্মানী নিরপেক্ষ বেলজিয়াম আক্রমন করে। ফলে বেলজিয়াম-ব্রিটেনের পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেন জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঘোষনা করে। বলশেভিক ( কম্যুনিস্ট) বিপ্লবের ফলে ১৯১৭ সালে রাশিয়া যুদ্ধ ত্যাগ করে। কিন্তু ফ্রান্স ব্রিটেনকে রসদ যোগান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রর এই অভিযোগে জার্মান সাবমেরিন যুক্তরাষ্ট্রের ৭ টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র তখন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যুদ্ধকে বিশ্বযুদ্ধে রূপ দেয়।এই যুদ্ধের একপক্ষে ছিল ওসমানীয় সাম্রাজ্য, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, জার্মানিবুলগেরিয়া। এদের বলা হতো কেন্দ্রীয় শক্তি। আর অপরপক্ষে ছিল সার্বিয়া, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, রুমানিয়াযুক্তরাষ্ট্র। এদের বলা হতো মিত্রশক্তি

Sinking of the RMS Lusitania
জার্মান সাবমেরিনদের ডুবিয়ে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ। Image Source : https://en.wikipedia.org/wiki/Sinking_of_the_RMS_Lusitania#/media/File:Bundesarchiv_DVM_10_Bild-23-61-17,_Untergang_der_%22Lusitania%22.jpg

মূলত ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ কে হত্যা করাই একমাত্র কারণ ছিল না প্রথম বিশ্বযুদ্ধের। প্রতিটা রাষ্ট্রই স্ব স্ব স্বার্থ হাসিল করার জন্যই যুদ্ধে জড়িয়ে ছিল। আসুন এক নজরে সেই সময়ে দেশগুলোর অবস্থান কেমন ছিল সেটা দেখে নেই।

  • জার্মানি রাষ্ট্র হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে ১৮৭১ সালে। তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদের যুগে ক্ষমতায় আসেন কাইজার দ্বিতীয় উইলহেইম।  এটা ১৮৯৮ সালের কথা। তিনি ছিলেন অনেক উচ্চাকাঙ্খী সম্রাট।তার মনে ইউরোপের বাইরেও সাম্রাজ্য স্থাপনের খায়েশ জেগেছিল। অবশ্য সেই সময় জার্মানদের অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তির যে অবস্থা ছিল তাতে এই স্বপ্ন দেখা ভুল কিছু ছিল না।এ কারণে অষ্ট্রিয়া সাহায্য চাওয়া মাত্রই জার্মানি তাতে রাজি হয়ে যায় এবং যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
  • সেই সময় রাশিয়ার সম্রাট ছিল দ্বিতীয় নিকোলাস। তার মনে ছিল ক্ষয়িষ্ণু অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্যের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করার তীব্র বাসনা। কারণ, রাশিয়ায় তখন কম্যুনিস্ট বিপ্লব শুরু হয়েছিল। তাই সম্রাট চাচ্ছিলেন জনগণের নজর অন্য দিকে ফেরাতে। তার ধারণা ছিল একটি যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমেই সেটি সম্ভব।কিন্তু অস্ট্রিয়ার মাধ্যমে সার্বিয়ায় জার্মানির উপস্থিতি রাশিয়ার কাছে নিশ্চিত হুমকি মনে হয়। এ কারণে রাশিয়াও জার্মানির বিরুদ্ধে গিয়ে সার্বিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় ।
  • প্রচন্ড শক্তিশালী নৌ-শক্তির অধিকারী ব্রিটেন সাম্রাজ্যটা ছিল একটি দ্বীপরাষ্ট্র ,যার অবস্থান ছিল ভৌগলিকভাবে ইউরোপের বাইরে। সেই সময় অর্থনীতির ক্ষেত্রে সমুদ্রপথ ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ব্রিটেনের নৌ-সামরিক শক্তি সমুদ্রপথে তাদের একক আধিপত্য বিস্তারে ভূমিকা রাখে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এর কলোনিগুলোর। যার সাহায্যে  ব্রিটেন ছিল তৎকালীন বিশ্বে একক পরাশক্তি। তাই  জার্মান উত্থান ছিল ব্রিটেনের চোখে নিজ শক্তির প্রতি হুমকি স্বরূপ। ফলে জার্মানরা বেলজিয়াম আক্রমণ  করার পর ব্রিটেন আর বসে থাকেন নি। জার্মানদের শক্তি খর্ব করার জন্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ।
  • অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরীঅটোমান সাম্রাজ্য অতীতে প্রচন্ড শক্তিশালী ছিল। তাই তাদের স্বপ্ন ছিল জার্মানীর সাহায্যে তাদের হারানো ক্ষমতা ফিরে পাবার ।
  • ফ্রান্স তখন বেশ ভাল কন্ডিশনে ছিল। কারণ, তারা আফ্রিকার কলোনী থেকে প্রাপ্ত সম্পদের দ্বারা অর্থনীতিতে অনেক উন্নত ছিল। কিন্তু শক্তিশালী জার্মানী মানেই তাদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি।এ কারণে ফ্রান্স নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্য রাশিয়ার সাথে মিলে সার্বিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
  • সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল অর্থনীতি এবং ব্যাপক সামরিক শক্তিতে শক্তিশালী একটি রাষ্ট্র। কিন্তু তাদের নীতি ছিল যেকোন ইউরোপীয়ান ঝামেলার বাইরে থাকা। ফ্রান্স ব্রিটেনকে রসদ যোগান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগে জার্মান সাবমেরিন যুক্তরাষ্ট্রের ৭ টি জাহাজ ডুবিয়ে না দিলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়াত না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবঃ 

১। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিকদের মৃত্যু হার ছিল আশংকাজনক। প্রায় ৯ মিলিয়ন সৈন্য নিহত হয় যেটা ছিল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মোট সৈন্যের ১৫% । তাছাড়া প্রায় লক্ষাধিক সৈন্য বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়ে পংগু হয়ে যায়। শুধু সৈন্যই না মারা গিয়েছে অনেক সাধারণ মানুষও। সেই সময় ব্রিটেনের নাগরিকরা বলত তারা একটি প্রজন্মকে হারিয়ে ফেলছে। ফ্রান্সের ক্ষেত্রেও কথাটি যথার্থ বলা চলে। কারণ, সেখানে যারা নিহত হয়েছিল তাদের ২০%  এরই বয়স ছিল ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।

Providing first Aid in World War I
যুদ্ধে আহত এক সৈনিককে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। Image Source: https://cdn.theatlantic.com/assets/media/img/photo/2016/11/world-war-i-in-photos-the-western-f-1/w_01/main_1200.jpg?1479064170

২। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের অর্থনীতির উপর মারাত্নক প্রভাব ফেলেছিল। এই যুদ্ধে শুধু ব্রিটেনরই খরচ হয়েছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়নেও বেশি ইউরো। কেন্দ্রীয় শক্তি ও মিত্রশক্তি উভয়ই যুদ্ধের খরচ চালানোর জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো ধার নিয়েছিল অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে। ১৯১৮ সালের যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ বিলিয়ন ডলার ধার দেয় ফ্রান্সব্রিটেনকে১৯২০ সালে ফ্রান্সব্রিটেন তাদের মোট সরকারী খরচের প্রায় এক তৃতীয়াংশ টাকাই খরচ করেছিল ধার পরিশোধের জন্য। ব্রিটেন কখনোই আর তাদের সেই যুদ্ধ পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক আধিপত্য ফিরিয়ে আনতে পারেনি। উল্টা তারা অনেক বৈদেশিক বাজার হারায়।

Destroying a lan in France in WW1
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ফ্রান্সের একটি অবকাঠামোতে চালানো ধ্বংসযজ্ঞ । Image Source : https://cdn.theatlantic.com/assets/media/img/photo/2016/11/world-war-i-in-photos-the-western-f-1/w_04/main_1200.jpg?1479064170

ইউরোপের অর্থনীতি ধসের আরেকটি বড় কারণ হল অবাধ ধ্বংসলীলা। যেখানেই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে সেখানেই চলেছে ধ্বংসযজ্ঞ । জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে ঘরবাড়ি, জমিজামা,ইন্ড্রাস্ট্রি সবকিছু। সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ফ্রান্স। তাদের ২ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমি,ফ্যাক্টরি, রেললাইন সব ধ্বংস হয়ে গেছিল। বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, ইতালি এবং সার্বিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ইড্রাস্ট্রি,রেললাইন, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল পুনরায় নির্মাণ এবং জমি থেকে অবিস্ফোরিত সেলগুলো অপসারণ করে পুনরায় আবাদ উপযোগী করে তোলা আবশ্যক ছিল। সবকিছু মিলিয়ে ১৯১৯ সালে ইউরোপ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল।

Two Dead British in World War One
যুদ্ধে নিহত দুই ব্রিটিশ সৈনিক। Image Source : https://cdn.theatlantic.com/assets/media/img/photo/2016/11/world-war-i-in-photos-the-western-f-1/w_22/main_1200.jpg?1479064170

৩। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দুই বিজয়ী রাষ্ট্র ব্রিটেনফ্রান্সকে তেমন কোন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হয়নি। কিন্তু মধ্য ইউরোপে এর ব্যাপক প্রভাব পরে । সেখানে সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং মানচিত্র নতুন করে অংকন করতে হয়েছে। ১৯১৪ সালের পূর্বে মধ্য ইউরোপ বিভিন্ন বহুজাতিক রাজকীয় শাসক দ্বরা শাসিত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের পর এই শাসকগোষ্ঠীই ধ্বংস হয়ে গেছিল।

  • এই যুদ্ধের পর জার্মান, রাশিয়ান এবং হবসসবার্গ এমপায়ারগুলি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছিল।
  • সমগ্র ইউরোপে কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল।
  • দুর্ভিক্ষ ,প্রাণঘাতী ফ্লু মহামারী দেখা দিয়েছিল।
  • যুদ্ধবিরতির চুক্তি করার আগে জার্মানিতে পুরনো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি বিপ্লব ঘটেছিল।কিয়েলে বিদ্রোহীরা সমাজতান্ত্রিকদের নেতৃত্বে অন্য বিদ্রোহের সূত্রপাত করেছিল।বাভারিয়ার নিজেদের একটি সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। ৯ নভেম্বর ১৯১৮ সালে উইলহেইম সিংহাসন ছেড়ে নেদারল্যান্ডে পালিয়ে যায়। পরের দিন, সমাজতান্ত্রিক নেতা ফার্দরিচ এবার্ট জার্মানি প্রজাতন্ত্রের নতুন নেতা হয়ে ওঠে।
  • ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় দুটি বিপ্লব ঘটে। এর মধ্যে একটি ছিল জারিস্ট শাসনকে ভূপাতিত করে একটি স্থায়ী সরকার গঠন করে। এদের উদ্দেশ্য ছিল  স্বাধীনভাবে নির্বাচন শুরু করা।অপরটি ছিল,বলশেভিক কর্তৃক একনায়কত্বের ক্ষমতা দখল করা।এদের ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হতে থাকে যার ফলে ১৯২০ সাল পর্যন্ত রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ লেগে ছিল।
  • অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয় সাম্রাজ্যের প্রতন ঘটে এবং অস্ট্রিয়া ,হাঙ্গেরি এবং এদের অধিভুক্ত অন্যান্য জাতি নিজেদের  পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে।
  • ১৯২২ সালে তুর্কি সুলতানের পতন ঘটে। মোস্তাফা কামাল স্বৈরাচার শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
US victory
যুদ্ধ শেষ বিজয়ী আমেরিকান সৈন্যরা ঘরে ফিরছে। Image Source : https://cdn.theatlantic.com/assets/media/img/photo/2016/11/world-war-i-in-photos-the-western-f-1/w_44/main_1200.jpg?1479064171

৪। ইউরোপের বাইরেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক প্রভাব পরে।নিজেদের আড়াল করার নীতি থেকে সরে এসে যুদ্ধের শেষ দিকে যোগ দিয়েই মুল নায়কের আসনে বসে যায় যুক্তরাষ্ট্র।যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠে অর্থনীতি এবং সামরিক উভয় থেকেই সব থেকে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র।আমেরিকা ইউরোপে খাদ্য, কাঁচামাল ও যুদ্ধোপকরণ পাঠানোর ফলে শিল্প ও বাণিজ্যে উন্নতি লাভ করে।প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে যান্ত্রিকীকরণ এবং প্লাস্টিকের উন্নয়ন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বনেতায় পরিণত করে।

এইগুলো ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল। এই কয়েকটি রাষ্ট্র ছাড়াও জাপান, চীনসহ প্রায় পুরা বিশ্বেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব পড়েছিল।যুদ্ধের পর সবাই ভেবেছিল এমন মানবসৃষ্ট দুর্যোগ আর ঘটবে না, বিশ্ববাসীকে আর যুদ্ধের অভিশাপ বইতে হবে না। কিন্তু লীগ অব নেশনস কার্যকরী বিশ্বসংস্থা হয়ে উঠতে না পারা, ভার্সাই চুক্তি দ্বারা জার্মানিকে কোণঠাসা করে ফেলা এবং জার্মানি ও ইতালিতে যথাক্রমে হিটলার ও মুসোলীনির  উত্থান আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট রচনা করে। সেই গল্প না হয় আরেকদিন শোনাব। ধন্যবাদ সবাইকে।

    • Featured Image Source : https://cdn.theatlantic.com/assets/media/img/photo/2016/11/world-war-i-in-photos-the-western-f/w_14/main_1200.jpg?1478729903

Author: Md Rasel

Co-Founder & Editor